ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ও তার সংস্কৃতি

গেল শতকের প্রথম দিকে ভদ্রলোক চিনার চিহ্ন বলতে একটি বিষয়ই ছিল, তা হচ্ছে তাদের সংস্কৃতি, জীবনবোধ, জীবন চর্চার ধরণ। কিন্তু আমাদের এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এক শতকের নয়। আমাদের এ ভুখন্ডের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, উন্নয়ন, স্থাপনত্যশৈলী সবগুলোই একটি আরেকটির সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত। ভৌগলিকভাবে ভারতীয় উপমহাদেশ হতে পাঁচটি দণি এশীয় দেশের জন্ম হয়- বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল এবং ভূটান। তাই ব্যাষ্টিক ও সামস্টিকভাবে এগুলোর ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ না হলে শুধুমাত্র একটি চোট্ট অঞ্চলের ঐতিহ্য বিশ্লেষণে আসল চেহারা পাওয়া যাবে না। এ অঞ্চলের ঐতিহ্যের ধারাকে ৫টি পর্বে ভাগ করা যায়:- ১. প্রাচীন যুগ ২. সুলতানী আমল ও মোঘলদের যুগ ৩. ব্রিটিশ আমল ৪. পাকিস্তান ও স্বাধীনতা পূর্ব সময়। ৫. বর্তমান প্রাচীন যুগ: এই উপমহাদেশের সিন্ধু সভ্যতাকে (খ্রীষ্টপূর্ব ৩২০০-১৬০০) সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সে সময়ে তামা, ব্রোঞ্জ, সোনা এবং রূপার ব্যবহার ছিল। সেখানকার লোকজন সাপসহ বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা করত। আরব সাগরের উত্তর প্রান্ত হতে সিন্ধু নদ হয়ে উত্তর আফগানিস্তান এর আমু দরিয়া পর্যন্ত প্রায় ৫ ল বর্গমাইল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এ সভ্যতা। কৃষি ভিত্তিক হলেও পরিকল্পিত নগরায়ন, নাগরিক সুযোগ-সুবিধা এবং বহিবিশ্বের সাথে বালিজ্যিক যোগাযোগ ছিল এ সভ্যতার বিশেষ দিক। এখনো এ সভ্যতার অনেক নগর অনাবি®কৃত আছে। দুটি প্রধান নগর মহেঞ্জোদারো উপকুল থেকে যা ৩০০ মাইল দূরে এবং তার চেয়েও ৪০০ মাইল দূরে পঞ্জাব নদীর তীরে হরপ্পা উন্নত স্থাপত্যশৈলী সম্পন্ন ছিল। দুটি নগরেই জনসংখ্যা ৩৫০০০ এর উপর ছিল। ইটের ইমারত ৩ তলা পর্যšত, যেখানে ঘরের ভেতরে প্রশস্ত টয়লেট ও গোসলখানা ছিল এবং স্যুয়ারেজ লাইন প্রধান সড়কের নীচ দিয়ে চলে যায়। সিন্ধু সভ্যতা আবিষ্কারের আগে আর্য সভ্যতাকে এ উপমহাদেশের প্রাচীন সভ্যতা ধরা হয়। আর্যগন মধ্য এশিয়া বা ইউরোপ হতে ভারতে আসে এবং স্থানীয় জনগনেকে পরাজিত করে ভারতের উত্তর পূর্ব অঞ্চলে আস্তানা গাঁড়ে। স্থানীয়রা বন-জঙ্গলে বিতাড়িত হয়। যারা বন্দী হয় তাদেরকে দাস বানানো হয়। সাতটি নদীঘেরা এ অঞ্চলে আর্যরা নিজেদের শ্রেষ্ট জাতি এবং অন্যদের ‘অসূর’ হিসেবে ঘোষণা দেয়। নদী সাতটি হচ্ছে সিন্ধু, সতদ্রু, বিপাশা, ইরাবতি, চন্দ্রভাগা, বিতাস্তা এবং সরস্বতী। এগুলোকে তারা একত্রে বলত ‘সপ্তসিন্ধু’। পরিবার ছিল তাদের সামাজিক জীবনের মূল প্রতিষ্ঠান এবং পিতা ছিল পরিবারের প্রধান। পুরুষরা একধিক স্ত্রী গ্রহণ করতো, মহিলাদের তেমনটির অনুমতি ছিল না। সময়ের ব্যবধানে তাদের মধ্যে চারটি গোত্র তৈরী হয়। ‘ব্র’,,েৈত্রয়, বৈশ্ব ও সূদ্র। ছাষাবাদ ও পোষাপ্রাণী পালন ছিল আর্যদের প্রধান পেশা। তারা কোন প্রতীমা পূজা করত না। তারা প্রার্থনা করত স্বর্গের প্রভূ ‘দিয়াউস’ আকাশের প্রভু ‘ভরুণা’ বজ্রের প্রভু ‘ইন্দ্রা’, আলোর প্রভু ‘সূর্যিয়া’, প্রভাতের প্রভু ‘ঊষা’ এর। তাদের ধমৃগ্রন্থ ছিল ‘বেদ’ এবং তারা বিশ্বাস করত এটি কোন মানুষের রচিত নয়। বেদ এর চারটি অধ্যায় “ঋগ, স্যাম, ইয়াজু এবং অথর্ব”। খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে ধর্মীয় সংস্কার শুরু হয় উপমহাদেশে। এসময় মানুষ বৈদিক ধর্ম হতে দূরে সরে যায়। উল্লেখযোগ্য দুটি ধর্ম এসময় বিস্তার লাভ করে- ইয়াহুদী ও বৌদ্ধ। এসময় ভারত অনেকগুলো রাজ্যে বিভক্ত ছিল। এগুলোর মাঝে ১৬টি রাজ্য মোটামুটি শক্তিশালী ছিল। একসঙ্গে এগুলোকে ১৬ মহাজনপদ বল হয়। বেশিরভাগই শাসন করতে স্বৈরাচারী রাজগণ। অনৈক্য ও সংঘবদ্ধতার অভাবই এসব অঞ্চলে বিদেশী আগ্রসানের মূল কারণ। পারস্য সম্রাট সাইরাস হচ্ছে প্রথম ব্যক্তি যিনি আর্যদের পর ভারতের কিছু অংশ জয় করে। পরবর্তীতে খ্রীষ্টপূর্ব ৩২৭ খ্রিষ্টান্দে আলোকজান্ডার ভারত জয় করেন এবং ১৯ মাস অবস্থান করেন। তার প্রস্থানের পর গ্রীক শাসন ২ বছরের বেশী স্থায়ী হয়নি। তবে গ্রীকশাসন ছোট ছোট রাজ্যগুলোর মধ্যে একতার উপলব্ধি ও দূরদৃষ্টি তৈরী করে। সি রায় চৌধুরীর ভাষায় মৌর্য সম্রাট (প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য) হচ্ছেন উপমাহাদেশের প্রথম সম্রাট যিনি বৃহত্তর ভারতীয় সম্রাজ্যের ঐতিহাসিক স্থপতি। তার মৃত্যুর পর পুত্র বিন্দুসারা এবং তার পর তদীয়পুত্র ‘আশোকা’ শাসনভার গ্রহণ করেন। সম্রাট আশোকা একজন ধর্মান্তরিত বৌদ্ধ ছিলেন। তার সময়ে বৌদ্ধ ধর্মকে ভারতের রাষ্ট্রীয় ধর্ম করা হয়। শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য তিনি আইনের সংস্কার করেন ও বিশেষ বাহিনীর ব্যবস্থা করেন। সম্রাট আশোকের মৃত্য���র পর উপমহাদেশের ঐক্য ও সংহতি আবার ভেঙ্গে পড়ে এবং বিদেশী আগ্রাসন শুরু হয়ে যায়। হিউনাস নামে একটি দুধর্ষ জাতি মধ্য এশিয়া হতে এসে ভারতের উত্তরাংশে শাসন কায়েম করে। এমনি অস্থিরতার মাঝে পুশৈবতি নামে একটি নতুন বংশের উত্থান ঘটে এবং পাঞ্চাবে শক্তিশালী হয়ে উঠে। এই বংশের একজন শক্তিশালী রাজা প্রভাকর বর্ধনা হিউনাসদের পরাজিত করে। এই বংশের শাসক হিসেবে প্রভাকরের নাতি হর্ষবর্ধনা সবচেয়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে এবং ৪১ বছর (৬০৬-৬০৭ খ্রীষ্টাব্দ) শাসন করে। তার সময়ে শিা ব্যবস্থা গড়ে উঠে, ব্যবসা বানিজ্যের প্রসার ঘটে। চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ তার খুবই সুনাম করেন। সুলতানী আমল ও মোঘলদের যুগ: এর প্রথম পর্ব শুরু হয় সিন্দের (বর্তমান করাচী) রাজা দাহির ও ইরাকের শাসক হাজ্জাজ বিন ইউসুফের সংঘাতের মধ্য দিয়ে। সিংহল (শ্রীলংকা) হতে উপটৌকন বাহী (হাজ্জাজ ও খলিফা ওয়ালিদের জন) জাহাজ সিন্দু উপত্যকার দেবল বন্দরে লুট হয়ে যায় এবং জাহাজের আরোহীরা বন্দী হয়। হাজ্জাজ রাজা দাহিরের কাছে এর প্রতিকার চাইলে দাহির অস্বীকার করেন। ফলে ৭১২ সালে হাজ্জাজ তার সেনাপতি মোহাম্মদ বিন কাসিমকে সিন্দু অভিযানে পাঠান এবং দাহিরের রাজত্ব জয়লাভ করেন। মোহাম্মদ বিন কাসিম সেখানে সু-শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। এ বিজয় অভিযান শুধু সিন্ধু প্রদেশ কেন্দ্রীক সীমাবদ্ধ থাকলেও এটি একটি নতুন যুগের সূচনা করে। সাংস্কৃতিক বিবর্তনের পথও উন্মোচন করে। ২য় পর্ব সম্পাদন করেন সুলতান মাহমুদ গজনবী। ১০০০-১০২৭ খ্রীষ্টাবেন্দর মাঝে তিনি ১৭ বার ভারতে অভিযান পরিচালনা করেন। তবে ভারতে স্থায়ী সম্রাজ্য গঠনের ব্যাপারে তার তেমন তৎপরতা ল্য করা যায় নি। ভারতের আভ্যন্তরীন দূর্বলতা সমূহ তিনি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে গেছেন। সুলতান মাহমুদ গজনবীর মৃত্যুর ১৫০ বছর পর ৩য় পর্ব শুরু করেন মোহাম্মদ ঘোরি। রাজপুত রাজা পৃথ্বীরাজকে পরাজিত করে তিনি ভারতে স্থায়ী মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করেন এবং কুতুব উদ্দিন আইবেককে প্রশাসক নিয়োগ করেন। বাংলায় মুসলমানদের শাসন, ঐতিহ্যের অংশ হওয়া সর্বেেত্রই রাজনৈতিক শক্তির বিচরনের আগে আর্থ-সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক প্রবাহ অবদান রাখতে শুরু করে। মুসলমানরা বাংলা বিজয়ের আগে তাদের সংস্কৃতিকে পাঠিয়েছে। চট্টগ্রাম, নোয়াখালীসহ উপক’লীয় এলাকাসমূহে ব্যবসায়িক কারনে অষ্টম শতাব্দী হতে বসবাস শুরু করে। তখন হতেই তাদের আচার-ব্যবহার, লেনদেন, আত্মীয়তা, পারস্পারিক সম্পর্ক ও বোঝাপড়া, অপরের কল্যাণ ও সহমর্মিতা, আমানতদারীতা, সততা ও নিষ্ঠা, ন্যায়পরায়নতা, ভাষার মাধুর্যতা ‘কোমলতা’, উন্নত চিন্তা ও উদারতা ইত্যাদি স্থানীয় জনগণকে মুগ্ধ করে। অনেকে বিয়ে-শাদী করে এখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন। এগার শতকের দিকে কিছু মুসলিম সাধক বাংলায় আসেন। তাদের মধ্যে শাহ সুলতান রুমী (১০৫৩ খৃ:) এবং বাবা আদম (১১৯৯ খৃ:) উল্লেখযোগ্য। এসব সূফী-সাধকদের প্রভাবে স্থানীয় জনগন গণহারে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। ১২০৪-০৫ সালে বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলায় মুসলিম শাসনের সূত্রপাত হয়। তখন হতে বাংলায় ইসলামী সংস্কৃতির আভা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে মুহাম্মদ সিরান খলজি, আলি মর্দান খলজি এবং ওসামউদ্দিন এওয়াজ খলজি ১২০৬-১২২৭ সাল পর্যন্ত বাংলা শাসন করেন। এওয়াজ খলজীর মৃত্যুর পর বাংলা সরাসরি দিল্লী শাসনের অধীনে চলে যায়। ১৫ জন শাসক ১২২৭-১৩০১ সাল পর্যন্ত ৬০ বছর বাংলা শাসন করেন। এদের মধ্যে বুগরাখান, কায়কোবাদ ও কায়কাউস উল্লেখযোগ্য। কায়কাউসের মৃত্যুর পর ১৩০১ সালে মালিক ফিরোজ ইতগিন সুলতান শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহ নাম ধারন করে ১৩০১ -১৩২২ পর্যন্ত বাংলা শাসন করেন। পরবর্তীতে গিয়াসউদ্দিন বাহাদুর, বাহারাম খান, আইয়াজউদ্দিন ইয়াহইয়া, কাদেরখান প্রমুখ ১৩৩৮ সাল পর্যন্ত বাংলা শাসন করেন। ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ দিল্লীর অধিনস্ত না থেকে স্বাধীনভাবে বাংলায় শাসন কার্য পরিচালনা করেন ১৩৩৮-১৩৪৯ খৃ: পর্যন্ত। তার মৃত্যুর পর ইখতিয়ার উদ্দিন গাজী শাহ ১৩৫২ খৃ: পর্যন্ত মতায় থাকেন। ১৩৪২ থেকে অন্য অংশে শাসন করতে থাকা শামসুদ্দিন ইলয়াছ শাহ ইফতিয়ারউদ্দিন গাজীকে পরাজিত করে সোনারগাঁও দখল করেন এবং ১৩৫২ খৃ: পর্যন্ত বাংলা শাসন করেন। এরপর সুলতান সিকান্দার শাহ ১৩৯৩ পর্যন্ত, গিয়াস উদ্দিন আযম শাহ (১৩৯৩-১৪১১) শাসন করেন। পরবর্তী বছরগুলোতে শাসক ছিলেন সাইফউদ্দিন হাফজা, শিহাব উদ্দিন, আলাউদ্দিন ফিরোজ এবং রাজা গনেশ প্রমুখ। রাজা গনেশের মৃত্যুর পর তারপুত্র জাদু জালালুদ্দিন মাহমুদ শাহ নামে শাসক হন ১৪১৮ সালে। তিনি ধর্মপ্রাণ মুসলমান ছিলেন এবং শেষ দিকে উপাদি ধারন করেন আল্লাহর খলিফা। তারপর পুত্র সামুসদ্দিন আহমদ শাহ ১৪৩১-১৪৪২ পর্যন্ত বাংলা শাসন করেন। তার মৃত্যুর পর ১৪৪২-১৪৮৭ খৃ: পর্যন্ত বাংলা শাসন করেন ইলিয়াছ শাহী বংশের শাসকগন যেমন- নসরুদ্দিন মাহমুদ, রোকনুদ্দিন বারবাক শাহ, এবং ফতেহশাহ। এসময হাবসী কৃতদাসদের নিয়ে শক্তিশালী সেনাবাহীনী গড়ে তোলা হয়। পরর্বীতে এই কৃতদাসরা শক্তিশালী হয়ে মতা দখল করে ১৪৮৭ খৃ:। চারজন আবিসিনিয়ান সুলতান ৬ বছর (১৪৯৩-১৫৩৮) বাংলা শাসন করেন। ১৫৩৮ সালে শেরখান বাংলায় অভিযান পরিচালনা করেন এবং স্বাধীন সালতানাত প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় ভারতে মোঘল শাসন চলছিল। সম্রাট জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর ভারতে মোঘল সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করলেও বাংলা তখন বিজয় করতে পারেন নি। বাবর বাংলার সুলতান নুসরাত শাহ এর সাথে চুক্তি করেন। সম্রাট হুমায়ুন ১৫৩৮ সালে গৌড় দখল করেন। ১৫৪০ সালে শের শাহ কানুযের যুদ্ধে মোঘল প্রশাসক জাহাঙ্গীর কুলিকে পরাজিত করে বাংলায় শুর বংশের শাসন বিস্তৃত করেন। ১৫৪০-১৫৭৬ পর্যন্ত বাংলা শাসন করেন শূর ও কারানী শাসকগণ। ১৫৭৬ সালে সম্রাট আকবর বাংলা বিজয় করলেও বারভূঞাদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মুখে নিয়ন্ত্রন রাখতে পারেন নি। আকবর পুত্র সম্রাট জাহাঙ্গীর ১৬০৮ সালে ভূঞাদের মধ্যহতে ইসলামখান চিশতীকে সুবেদার নিয়োগ করে বারভূঞার ঐক্যে ফাটল ধরান। পরবর্তীতে মোঘল সুবেদারগ বাংলা শাসন করেন। যেমন-সূজা মীর জুমলা, শায়েস্তাখান, মর্শিদকুলী খান এবং আলীবর্দী খান। শায়েস্তাখানের শেষ দিকে তার সাথে বৃটিশ ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানীর সংঘাত শুরু হয় এবং তিনি ইংরেজদের বিতাড়িত করেন। ১৭০০-১৭২৭ সাল পর্যন্ত বাংলার দেওয়ান থাকেন মর্শিদ কুলি খান। পরবর্তীতে সূজাউদ্দিন খান, সরফরাজখান, আলীবর্দীখান শাসক হন।। আলীবর্দী খানের সময়ে সতর্ক পর্যবেনের মধ্যে ইংরেজ, ফরাসী এবং ওলন্দাজরা এখানে ব্যবসা করে। ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল আলীবর্দীখান তার নাতি সিরাজ উদ্দদৌলাকে নওয়াব নিযুক্ত করে মারা যান। বৃটিশ আমল: একটি প্রসাদ ষড়যন্ত্রের কাছে পরাজিত হন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন যুদ্ধ নাটকের মধ্য দিয়ে পলাশীর আম্র কাননে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত যায়। বৃটিশগন প্রথমত দেশীয় পুতুল নবাব দিয়ে দেশ শাসন করে। এ সময় শাসন বিভাগ, বিচার বিভাগ, শিা বিভাগ সবত্র প্রায় পূর্বের রীতি-পদ্ধতি বহাল ছিল। ১৭৬৪ সালে মীর কাসিমকে পরাজিত করার পর পূর্ণমতা দখলের মহড়া শুরু করে ইংরেজরা এবং পরবর্তীতে কোম্পানীর প্রত্য শাসন শুরু হয়। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিপ্লবের পর বৃটিশ পার্লামেন্টে ‘ভারত শাসন আইন’ পাশ হয় এবং ভারতে সরাসরি বৃটিশ শাসন চালু হয়। এরপর শাসন, বিচার, শিা, সাহিত্য সংস্কৃতি সর্বত্রই পূর্ণভাবে বৃটিশ পদ্ধতির চর্চা শুরু হয়। প্রচুর আন্দোলন-সংগ্রাম-বিদ্রোহ শেষে দ্বিজাতিতত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে বৃটিশরা বিদায় নেয় এবং ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। পাকিস্তান ও স্বাধীনতাপূর্ব সময়: ১২ শত মাইল ব্যবধানে পূর্ব ও পশ্চিম অংশ নিয়ে পাকিস্তান গঠিত হয়। পাকিস্তান সৃষ্টি হয় অনেক স্বপ্ন, আশা ও প্রতিশ্র“তির উপর।। কিন্ত অল্প দিনেই পূর্ব বাংলার মানুষের স্বপ্ন ভঙ্গ হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্টি তাদের দেয়া প্রতিশ্র“তি ভঙ্গ করে। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে অধিকার হতে বঞ্চিত করে উল্টো অত্যাচারের স্টীম রোলার চালায়। বাংলা ভাষার উপর আঘাত করে। রাজনীতি, অর্থনীতি সর্বেেত্রই বাংলার মানুষকে শোষণ করে। একটি রক্তসাগর পেরিয়ে ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে বর্তমান বাংলাদেশের জন্ম হয়। বর্তমান যুগ: হাজার বছরের অবহেলাতো ছিলই। বরাবরই আযাদীর চেষ্টায় সঙগ্রামী ছিল এ ভূখন্ডের মানুষ। সর্বশেষ প্রায় আড়াইশ বছর গোলামীর অপমানে সঞ্চিত ক্ষোভের বিস্ফোরনে বাংলাদেশের জন্ম হয়। এখানে ছিল আশা, ছিল স্বপ্ন, ছিল সংকল্প আপন পায়ে দাঁড়াবার, নিজেদের সমস্যা নিজেরা সমাধান করার। মরহুম শেখমুজিবুর রহমান থেকে সর্বশেষ শেখ হাসিনা প্রায় ১ ডজন সরকার দেশ শাসন করেছে। কাঙ্খিত স্বপ্ন পূরণ, বিজয় গাঁথা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক নিজস্বতা, টেকসই উন্নয়ন কোনটিই আমাদের অর্জিত হয়নি। সংপ্তি পরিসরে প্রায় ৫ হাজার বছরের রাজনৈতিক ইতিহাস স্মরণ করার উদ্দেশ্য ইতিহিাস চর্চা নয় বরং এই সুদীর্ঘ সময়ের বাঁকে বাঁকে আমরা যা লাভ করেছি আর যা হারিয়েছি তা উপলব্দি করা। আজকের প্রবন্ধ শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক প্রেতি বিবেচনায় লেখা হয়েছে। সরাসরি ব্যাখ্যা না আসলেও কিঞ্চিত আলোকপাত করা হয়েছে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অনন্য সংযোজন গুলোর বিষয়ে। সংস্কৃতি: সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ শব্দদুটি নিয়ে প্রচুর সংজ্ঞা ও বক্তব্য আছে। কখনো দুটি শব্দকে সমার্থক আবার কখনো ভিন্ন অর্থে সংজ্ঞায়িত করা হয়। মনীষীদের বিভিন্ন বক্তব্য হতে আমরা এর একটি সমাধান বের করতে পারি। সংস্কৃতি হচ্ছে জীবন থেকে উঠে আসা মনোভাব ও জীবন বোধের প্রকাশ যা মানুষের ব্যষ্টিক বা সামষ্টিকভাবে বহু বছরের ঐতিহ্যিক মুল্যবোধ দ্বারা গড়ে ইঠে। সংস্কৃতি হচ্ছে কাজ এবং মূল্যবোধ হচ্ছে সেই কাজ করার প্রেরণা। সংস্কৃতি হচ্ছে প্রকাশ্য কাজ যা মূল্যবোধ, পরিচিতি, বিশ্বাস, মনোভাব, সামাজিক বৈশিষ্ট্য্য ইত্যাদি বিষয়গুলোর উপর দাঁড়িয়ে থাকে। বিশ্বাস হচ্ছে ব্যক্তির চিন্তা; কিভাবে কি করা উচিৎ অথবা কি করতে হবে। কেউ যদি বিশ্বাস করে ধারালো চুরি দিয়ে হাত কাটা যাবে, তাহলে সে চুরি হতে নিরাপদ থাকার চেষ্টা করবে। পৃথিবীর প্রধান ধর্মগুলো যেমন: ইসলাম ধর্ম, খৃষ্ট ধর্ম, ইহুদীধর্ম, হিন্দু ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম বিশ্বাস ভিত্তিক নির্দেশনা ও ততত্বাবধান প্রদান করে থাকে। খ্রীষ্ট ধর্ম একজন খ্রীষ্টান নারীকে গোটাদেহ ঢেকে রাখতে বলে। যদি একজন খ্রীষ্টান নারী তার মাথা ঢেকে রাখতে ব্যর্থ হয় তবে তার মাথা মুন্ডন করে ফেলতে হবে। ইসলাম তার অনুসারীদের সকল অন্যায় হত্যা, রক্তপাত, সন্ত্রাস, দুর্ণীতি ইত্যাদি বহুবিদ বিষয়ে নিষেদ করে। আবার বান্দার হক, আল্লাহর হক ইত্যাদি বিষয়ে সুস্পষ্ট কথা বলে। জীবনের প্রতিটি সীমানাই ইসলাম স্পর্শ করেছে। এটাই বিশ্বাসভিত্তিক সংস্কৃতি। মনোভাব হচ্ছে বস্ত, ঘটনা অথবা মানুষ সম্পর্কে (পক্ষে/বিপক্ষে) মূল্যায়নধর্মী বক্তব্য ও অবস্থান। মনোভাব ও আচরণের মধ্যে প্রত্য সম্পর্ক রয়েছে। মনোভাব গড়ে উঠে পরিবেশ, প্রতিবেশ, পরিবার, সমাজ বিশ্বাস মূল্যবোধ, আর্থিক সামর্থ, সামাজিক অবস্থা ও অবস্থান সার্বিক পরিস্থিতিরি উপর ভিত্তি করে। এর উপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক প-বিপ তৈরী হয়, হত্যা-সন্ত্রাসের পথ প্রশস্ত হয়, পোষাকের উপর প্রভাব সৃষ্টি হয়। গবেষণার ফলাফল প্রভাবিত হয়। সামাজিক রীতিনীতি ও বৈশিষ্ট্য পৃথিবীর সর্বত্রই বিরাজমান। প্রবাদ, খানারবচন, ডাক, লোককথার ভিত্তিতে এসব রীতি-রেওয়াজ গড়ে উঠে। এগুলো সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে। কিন্ত বিশ্বাসের সাথে যদি সাংঘর্র্ষিক হয় আর কেউ সেগুলো ধরে রাখার চেষ্টা করে তবে তিনি/তারা আত্মপ্রবঞ্ছনায় ভূগবেন। সংস্কৃতি মূল্যবোধ ও পরিচিতির দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় পরিশীলিত হয়। এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়। পরিবার, শিা-প্রতিষ্ঠান, সরকার, অর্থনীতি, ঐতিহ্য, ভাষা, শিল্প ও সাহিত্য, সামাজিক শ্রেণী এবং ধর্ম ইত্যাদি প্রত্য ভূমিকা রাখে। এক্ষেত্রে ধর্ম সবচেয়ে প্রভাবশালী ভূমিকা রাখে। জীবন, জগৎ ও জগতে মানুষের অবস্থান বুঝতে সাহায্য করে ধর্ম। মানব ইতিহিাসের অনেক প্রাচীন সময় হতে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের, জাতের, গোত্রের, ধর্মের, বর্ণের মানুষ বাংলাদেশের এ ভুখন্ডে আসে। নানান ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে এ ভুখন্ডে অভিযোজিত হয়। মঙ্গোল, আর্য, আরব, তাতার, ইংরেজ, ওলন্দাজ, ফরাসী এবং আরো অনেকে তাদের বৈচিত্রময় সংস্কৃতি, ঐতিহ্যি ও বৈশিষ্ট্য বয়ে নিয়ে আসে এদেশে। কালের প্রবাহে এসব মিলে মিশে হাজার বছর ধরে চলে ব্যাপন অভিস্রবন প্রক্রিয়া। দ্রাবিড়িয়ানদের পাশাপাশি আরব, আর্য, তুর্কি-আফগান সাংস্কৃতিক উপাদান ছাড়াও কিছু সংস্কৃতিক উপদান আসে পূর্ব আফ্রিকা হতে। কিছু বছরের জন্য বাংলা শাসিত হয় আবিসিনিয়ার কয়েকজন সুলতান কর্তৃক। রাজ প্রসাদের নিরাপত্তায় আবিসিনিয়ান গার্ড রাখার রীতি ছিল। বাঙালী হিন্দু ও মুসলমানদের কারো কারো চেহারায় এই আবিসিনিয়ান বৈশিষ্ট্য ল্যণীয়। ষষ্টদশ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে বাংলার উপূলবর্তী এলাকায় পুর্তগীজ ও আরাকানিস দুস্যুদের দাপট ছিল, যারা মগ নামে পরিচিত। উপক’লীয় কিছু কিছু বাসিন্দাদের মাঝে এই উপাদানের শারীরিক নিদর্শন পাওয়া যায়। শিল্প, স্থাপনত্য, সাহিত্য সংস্কৃতি, ব্যবসা, বাণিজ্যে বাংলা সবচেয়ে বেশি সমৃদ্ধ হয় ইলিযাছ শাহী বংশের শাসনের সময়, ছন্দপতন হয় বৃটিশ আমালে। ইউরোপীয় প্রভাব মিশ্রীত স্থাপত্যে, শিল্পে, ব্যবসায়, বিচারে, আইনে, শিায় ও সংস্কৃতিতে। এসময় অনেক সমৃদ্ধি যেমন প্রসাদে, প্রযুক্তিতে, মেতনি আমরা হারিয়েছি সম্পদ, নিজস্বতা বিনষ্ট হয়েছে। ধোঁকা, প্রতারণার বীজ ঢুকে আমাদের ভুখন্ডে। ষঢ়যন্ত্রের রাজনীতি, পাকাপোক্ত হয়। শাসকদের দুর্ণীতি আনুষ্ঠানিকতা পায়। দায় সীমিত করে কোম্পানী আইন তৈরী করে এলিটদের স্বার্থ রায় ব্যবস্থা হয়। প্রহসনের বিচারের আয়োজন হয়। দেশজ সংস্কৃতি, নিজস্বতা ধ্বংসের ব্যবস্থা হয়। আমাদের ভাষা হাজার বছওে প্রচুর সমৃদ্ধি ও পূর্ণাঙ্গতা অর্জন করে। কালস্রোতে ভাঙ্গা-গড়ার খেলায় জন্ম হয় জারী-সারি- ভাটিয়ালী- মারফতি, মুর্শিদী, ভাওয়াইয়া, রবীন্দ্র, নজরুল এজাতীয় সঙ্গীতের শতধারা। গল্প, নাটক, উপন্যাস, কবিতা চর্চায় বহু মাত্রা যোগ হয়েছে। এ সময়ে এসে একটি বিষয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে সস্কৃতি চর্চা মানেই বল্গাহীন হওয়া নয়, জীবন সম্পর্কে নিরাসক্ত হওয়া নয়। সংস্কৃতিবান হওয়া মানে অগোচালো জীবন চর্চা নয়, উস্কো- খুস্কো হয়ে চলাফেরাও নয়। ইসলাম সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তার আলো ছড়ানোর পর হতে সংস্কৃতির মাত্রা পূর্ণতা পেযেছে। এখানে বেহেল্লাপনার সুযোগ নেই, নেই সীমানা অতিক্রম করার সুযোগও। তবে সৃস্টিশীলতা আর সব ধরণের বিকাশ- যার পেছনে বিশ্বাস ও মূল্যবোধের সমর্থন রয়েছে ইসলাম তাকে বরাবরই উৎসাহিত করেছে । বাংলাদেশে সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে যারা ইসলামকে অনুসরণ করেন বা করতে চান, তাদেও সামনে বহু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ চ্যালেঞ্জে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য প্রচুর সাধনা প্রযোজন। ঐতিহাসিক ও নৃতাত্তিক বিশ্লেষণ থেকে নিজেদের স্বপক্ষে প্রমান যেমন খুঁজে বের করতে হবে, তেমনি ইসলামের আলোতে সংস্কৃতি যে আরো উজ্জ্বল ও সমুন্নত হয় তা বাস্তবে প্রমান করতে হবে। অপসংস্কৃতির মোকাবেলায় ইসলামী সংস্কৃতির স্রোতধারাকে শক্তিশালী করতে হবে। একাজে সংস্কৃতি কর্মীদের চিন্তা, মেধা, শ্রম, সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হবে।

Tagged with:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*