রমজানের প্রস্তুতি -2

আlল্লাহর অফুরন্ত রহমতে আমরা রজব শেষ করে শাবানে প্রবেশ করেছি।

দুনিয়াজুড়ে রমযানের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। উম্মাহর ঐক্যের প্রতিকটির ঘ্রাণ পেতে শুরু করেছি আমরা। রোযা শুধু উপবাস নয় বরং এটি আমাদের সামগ্রিক কাজকর্ম নিয়ন্ত্রণ করে। সাহাবায়ে কেরাম ৬মাস পূর্ব হতে রমযানের প্রস্তুতি নিতেন। আমরা ১০টি ধাপে রমযানের প্রস্তুতি নিতে পারিঃ

১। মনসিকভাবে তৈরি হয়ে যেতে হবে। রমজান সম্পর্কে জানুন, পরিবারের সকল সদস্যকে সচেতন করুন। নিজের জীবন ও সময়গুলো চিহ্নিত করুন। কারো পরীক্ষা, কারো বাসা বদল, আত্মীয় স্বজনের বিয়ে শাদী, দেখা স্বাক্ষাত ইত্যাদি যাবতীয় বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরী করুন। যে কোন ধরনের কেনাকাটা যথাসাধ্য আগে শেষ করুন।

২। নফল রোযার অভ্যাস করুন। সাবান হচ্ছে রোযার প্রস্তুতিস্বরূপ, নফল রোযা রাখার শ্রেষ্ঠ সময়। উসামা বিন যায়দ রাঃ বলেন আমি রসুল সঃ কে জিজ্ঞেস করলাম ইয়া রসুলুল্লাহ আপনাকে শাবান মাসের মত এত অধিক রোযা রাখতে দেখিনি। রসুল সঃ বলেন এটি এমন মাস রজব ও রমজানের মাঝে যাতে মানুষ খুব বেশি মনযোগ দেয়না। আর এটি এমন মাস যখন মানুষের আমলনামা বিশ্বজগতের প্রভুর দরবারে উঠানো হয়। আমি চাই আমার আমল এমন সময় উঠুক যখন আমি রোযাদার। নাসাঈ।।
এ সময় রোযা শুরু করা সবচেয়ে ভাল প্রস্তুতির অংশ। এতে করে কাজকর্ম, পাকস্থলী ও ইচ্ছা আকাঙ্খার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায়।

৩। কোরআন তেলাওয়াত বাড়িয়ে দিন ও এর প্রতিফলনের চেষ্টা করুন। আল্লাহর সান্নিধ্য ও নৈকট্য অর্জনের জন্য তেলাওয়াত সেরা একটি উপাদান। পাশাপাশি সাধ্যমত নিজের জীবনে এর প্রতিফলন ঘটানোর সাধনা চাই। কোরআনের বসন্তকাল রমজান আসার আগেই নিজেদের সাজাই। কোরআনের আয়নায় নিজের দায়দায়িত্ব দেখি ও গভীর উপলব্দিতে নিয়ে আসি। একই বিষয় যখন নতুন করে অধ্যয়ন করবেন তখন নতুন নতুন দরজা উন্মুক্ত হবে। এটি কোরআনের মিরাকল। বেশি বেশি তাসবিহ পাঠ করি।

৪। সুন্নাহ সম্পর্কে আগের চেয়ে একটি হলেও বেশি জানার চেষ্টা করি এবং অনুসরন করি।;
আল্লাহ বলেন قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
অর্থাৎ;-বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভাল বাস, তাহলে আমাকে অনুসরণ কর, যাতে আল্লাহও তোমাদিগকে ভালবাসেন এবং তোমাদিগকে তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেন, আর আল্লাহ হলেন ক্ষমা কারী দয়ালু।আলে ইমরানঃ৩১/ নফল নামাজ, তাহাজ্জুদ এর নিয়মিত অভ্যাস থাকলেতো ভাল, না হয় এসময় চালু করা। টিভি, ফেসবুক, টুইটার ইত্যাদিতে সময় কমিয়ে যেকোন একটি সীরাত গ্রন্থ পূর্ণাঙ্গ অধ্যয়ন করুন।

৫। তাওবার নবায়ন অব্যাহত রাখি এবং নিয়মিত দোয়া করি। আমরা কেউই ভুলের উর্ধ্বে নই। রসুল সঃ বলেন “বনীআদম সকলেই গুনাহের মধ্যে থাকে। কিন্তু তারাই সর্বোত্তম যারা অব্যাহত তাওবা করে”(তিরমিযি) আমরা তাওবাকারি অবস্থায় রমজানে প্রবেশ করতে চাই। পাশাপাশি
اللَّهُمَّ بَارِك
ْ لَنَا فِى رَجَبٍ وَشَعْبَانَ وَبَلِّغْنَا رَمَضَان
َ এ দোয়াটি নিয়মিত পড়ি।

৬। যথাসাধ্য দান সাদকাহ করুন। পৃথিবী একটি চমৎকার জায়গা হবে যদি আমরা একে অপরকে সাহায্য করি। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে- রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দানকারী আল্লাহর নিকটতম, বেহেশতের নিকটতম এবং মানুষের নিকটতম হয়ে থাকে। আর দূরে থাকে জাহান্নাম থেকে। অপরদিকে কৃপণ ব্যক্তি দূরে অবস্থান করে আল্লাহ থেকে, বেহেশত থেকে এবং মানুষের কাছ থেকে। আর কাছাকাছি থাকে জাহান্নামের। অবশ্যই একজন জ্ঞানহীন দাতা একজন কৃপণ এবাদতকারীর তুলনায় আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়।’
আল্লাহ বলেনঃ
কে সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহকে উত্তম ধার দিবে, এরপর তিনি তার জন্যে তা বহুগুণে বৃদ্ধি করবেন এবং তার জন্যে রয়েছে সম্মানিত পুরস্কার। আল হাদীদ-১১।
রমজানে যখন হযরত জিবরাইল (আ.) নবিজীর কাছে নিয়মিত আসতেন এবং কোরআন পড়ে শোনাতেন, তখন তার দানশীলতা আরও বেড়ে যেত। আনাস (রা.) বলেন, ‘নবী করিম (সা.)-এর চেয়ে বেশি দানশীল আমি আর কাউকে দেখিনি’ (মুসলিম)। রমজানে এ আমলটি যাতে ছুটে না যায় এজন্য এখনি অভ্যাস করা উচিৎ।

৭। সুষম ও পরিমিত আহার করুন। চা- কফি কমিয়ে দিন। সকালবেলা নাস্তা একটু আগে করে ফেলুন। তিন বেলা খাবারের বাইরে নাস্তার অভ্যাস আপাতত ছেড়ে দিন। সাধারন খাবারের পরিমাণ অন্য সময়ের চেয়ে কমিয়ে নিন। রমজানের জন্য শরীরকে প্রস্তুত হওয়ার ইশারা দিন। ইমাম শাফি রঃ বলেন আমি ১৬ বছরে নিজেকে পূর্ণ করিনি। কারন এতে শরীর ভারী হয়ে যায়, পরিস্কার বুঝার ক্ষমতা নষ্ট হয়, ঘুম বাড়ায় এবং ইবাদতের ক্ষেত্রে দুর্বল করে দেয়।

৮। অবস্থার উন্নয়ন করুন। গতকালের চেয়ে আজকের দিনটি কিছুটা হলেও ভালো করুন। কোন খারাপ অভ্যাস থাকলে বদলে ফেলুন। আপনি একটি সকালও যদি বদলাতে না পারেন তাহলে একটি মাস কিভাবে বদলাবেন, জীবন ও সমাজ কিভাবে বদলাবেন? সকাল সকাল ঘুম ও রাতে উঠার অভ্যাস করুন। সম্ভব হলে ১ ঘন্টা করে দৈনিক ইতিকাফ করুন।

৯। রমযানের পুরো মাসের জন্য একটি কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ করুন। কর্ম ক্ষেত্রের সময় নির্দিষ্ট করা, সুন্নাত ও নফল কাজগুলো বেশি করার সময় ঠিক করে নেয়া, কমপক্ষে একবার কোরআন খতম করা, দৈনিক ১টি হলে ৩০দিনে ৩০টি আয়াত/হাদীস মুখস্থ করা, রমজানের উসিলায় প্রতিবেশীদের মাঝে দাওয়াতি কাজ ইত্যাদি সবগুলো বিষয়ে সুস্পষ্ট একশন প্লান করে নেয়া।

১০। পরিবারের সদস্যদের কাউন্সিলিং করা। কারো দুর্বলতা থাকলে মোটিভেট করা। কাজ ভাগ করে নেয়া, যাতে নারী সদস্যরাও বাড়তি আমলের সুযোগ পায়। কারো তেলাওয়াতে গলদ থাকলে সহীহ করার ব্যবস্থা করা ইত্যাদি।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*