শান্তি ও মানবতার জন্য ইসলাম

ইন্নাদ্বীনা ইনদাল্লাহিল ইসলাম -হাদীদ ১৫ “নিশ্চয়ই আল্লাহর একমাত্র মনোনীত দ্বীন ইসলাম।” হযরত আদম (আঃ) থেকে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) পর্যন্ত সমস্ত আম্বিয়ায়ে কেরাম এই শান্তির বীজই বপন করে গেছেন।

হযরত আদম (আঃ) হতে হযরত নূহ (আঃ) এর পূর্ব পর্যন্ত দ্বীন ছিল শিশু পর্যায়ে । এসময়ে শরীয়তের বিধি -বিধানও ছিল প্রাথমিক পর্যায়ের। এক জোড়া ছেলের সাথে অন্য জোড়া মেয়ের বিয়ে ইত্যাদি ধরণের বিষয়াদি নিয়ে পৃথিবীতে মানুষের বিকাশ ও মৌলিক জীবন পদ্ধতির চর্চাই ছিল শরীয়তের মৌলিক দিক। হযরত নূহ (আঃ) হতে মুসা (আঃ) এর পূর্ব পর্যন্ত দ্বীন কৈশোর অবস্হাপ্রাপ্ত হয়। এ সময় শরীয়তের হুকুম -আহকাম ও কড়াকড়ি আরোপ শুরু হয়। হযরত মূসা (আঃ) হতে হযরত ঈসা (আঃ) এর আগ পর্যন্ত দ্বীন পূর্ণাঙ্গ যৌবনে পদার্পণ করে। এসময় প্রতিবাদ, প্রতিরোধ,আঘাত,প্রত্যাঘাত ইত্যাদির প্রয়োজনীয়তা এবং চর্চা প্রতিষ্ঠিত হয়। হযরত ঈসা (আঃ) এর সময় এসে দ্বীন বার্ধক্য অর্থাৎ পরিণত অবস্হায় উপনীত হয়। এসময় সবর করা,আঘাত হজম করা ইত্যাদি অবস্হা পরিলক্ষিত হয় ।

সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী এবং রসূল, সাইয়্যেদুল মুরসালীন হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর সময় এসে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব সমন্বয় করে পূর্ণাঙ্গ দ্বীন হিসেবে ইসলাম আত্নপ্রকাশ করে। “আল ইয়াওমু আকমালতু লাকুম দ্বীনাকুম, ওয়া আতমামতু আলাইকুম নেয়মাতি ওরা রাদিইতু লাকুমুল ইসলামা দ্বীন”।  আর এ কারণেই নবী -রাসূলগণের মধ্যে ইসলাম কোন পার্থক্য রচনা করে না ‘লা নুফাররিকু বাইনা আহাদিম মির রিজালিকুম, ।

# শাব্দিক অর্থ :

ইসলাম একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ । ইসলাম শব্দের অনেকগুলো প্রত্যয় পাওয়া যায়। আসসালাম অর্থ শান্তি । আসসিলম অর্থ আত্নসমর্পন । সূল অর্থ মানোন্নয়ন । ইসলাম অর্থ উন্নয়ন । দারুল হরবের বিপরীত হচ্ছে দারুস সালাম । এখানে মানোন্নয়ন ,উন্নয়ন, ও শান্তি প্রতিষ্ঠার হন্য বিভিন্ন পর্যায়ের জিহাদ অপরিহার্য।

শান্তির সাথে ন্যায়বিচার শর্ত। ন্যায়বিচারের জন্য মানবতার প্রতিষ্ঠা জরুরি।  মানুষের মনুষ্যত্ববোধ বা মানবতাবোধের স্তর হচ্ছে যতটুকু সে রবের কাছে আত্নসমর্পন করে। যতটুকু মানুষ তার রবের কাছে আত্নসমর্পন করতে পারলো ততটুকুই তার ইসলাম। ইসলাম সকল প্রাকৃতিক সত্তার দাসত্ব থেকে মানুষকে মুক্ত করে এক আল্লাহর দাসত্বের কথা বলে । এ পথেই মানুষের আত্নিক উন্নয়ন সাধিত হয়। মৃত্যুও মানুষের এই ক্রমাগত উন্নয়ন ঠেকাতে পারে না । তাছাড়া সৃষ্টির আগে -পরে মানুষের অনুসন্ধিৎসুু মনের সকল প্রশ্নের জবাবই ইসলাম দিয়েছে।

#  মৌলিক বক্তব্য :

ইসলাম সব সময় মৌলিক বক্তব্য দিয়েছে । যুগ,কাল,সময়ের ঊর্ধ্বে এসব কালজয়ী ব্যবস্হাপত্র। এসবের মধ্যে কিছু আছে মাইক্রো -লেভেলে অনুসরণ করতে হবে। ব্যক্তি পর্যায়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যা জরুরি। তবে বেশিরভাগই হচ্ছে ম্যাক্রো -লেভেলে। সামষ্টিক পর্যায়ের কাজের প্রভাব ব্যষ্টিক পর্যায়েও পড়বে ।অনেকগুলো বেসিক কথার মধ্যে সীমিত পরিসরে কিছু মৌলিক বক্তব্য তুলে ধরছি :

#  এক :

সামগ্রিক ক্ষেত্রেই মানুষকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে রাখা হয়েছে । মানুষের মর্যাদা সকল সৃষ্টর সেরা স্হানে, প্রকৃত অর্থে উপরে রাখা হয়েছে । মানুষকেই একমাত্র খলিফার মর্যাদা দেয়া হয়েছে। আল্লাহ মানুষের কল্যাণেই জগতের সব কিছুকে সৃষ্ট করেছেন। “হুয়াল্লাজি খালাকালাকুম মা -ফিল আরদি জামিয়া “। তিনিই মহান আল্লাহ যিনি মানুষের মঙ্গলের জন্য পৃথিবীর সব কিছু সৃষ্ট করেছেন। (২:২৯)

মানুষকে আল্লা্হ্চ এত মর্যাদা দিলেন, সম্মানিত করলেন । তাহলে মানুষের কাছে মানুষের মর্যাদা কেমন হওয়া উচিত? ৬৩২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি সোয়া লক্ষ সাহাবী নিয়ে বিদায় হজ্বে যান রসূল (সাঃ)। ৯ জিলহজ্ব  আরাফাতের জাবালে রহমতের উঁচু  টিলায়  দাঁড়িয়ে যে ভাষণ দেন তার দ্বিতীয় কথাটি ছিল,’আজকের এই দিন,এই মাস,এই স্হান যেমন পবিত্র তেমনি তোমাদের জীবন ও সম্পদ পরস্পরের নিকট পবিত্র। আরেকটি পয়েন্ট ছিল, “আল্লাহর সাথে শরীক করো না , অন্যাভাবে একে অপরকে হত্যা করো না “। আল কুরআনে অন্যায়ভাবে একজন মানুষ হত্যা করাকে সমগ্র মানব জাতিকে হত্যার সমান বলা হয়েছে।

# দুই ::

ইসলামের সামাজিক সংস্কৃতিতে কোনো বংশ মর্যাদার স্হান রাখা হয়নি। সাদা -কালো ,আশরাফ -আতরাফ ,আরব -অনারব এর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই । বিদায় হজ্বের ভাষণে রসূল (সাঃ) বলেছেন, বংশমর্যাদা রহিত করা হলো ।

শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হচ্ছে তাকওয়া ও আমল। দাস -দাসীদের প্রতি সহায় হবে । তোমরা যা খাও,যা পরো তাই তাদেরকে দেবে। অপরাধ করলে প্রয়োজনে মুক্তি দেবে, কিন্তু নির্যাতন করবে না। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করবে না।  এ নিয়ে পূর্বের অনেক জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে।  ক্রীতদাসও যদি তোমাদের নেতা হয় তবে তাঁকে মেনে নেবে।

আমীরুল মুমিনীন হযরত আবু বকর (রাঃ) ক্রীতদাস উসামার নেতৃত্বে যুদ্ধবাহিনী প্রেরণ করেন যার অধীনে অনেক নেতৃস্হানীয় সাহাবীও ছিলেন।  দাস হিসেবে জন্ম নেয়া তারেক বিন জিয়াদ ৭১১ সালে রমযান মাসে স্পেনের ভিশিগোথ রাজার মুখোমুখি হন। তার সেনাপতিত্বে গোয়াদিল্যাত যুদ্ধসহ ছোট -বড় সব ক’টি  যুদ্ধে মুসমানরা বিজয়ী হয়। আন্দালুসিয়ায় (স্পেনে ) ৮০০ বছরের মুসলিম শাসনের গোড়াপত্তন হয় এসময়। ইউরোপের উজ্জ্বলতাও  শুরু হয় এসময় হতে। এ সময়ই প্রমাণিত হয় ইসলামের শাসন ব্যবস্তায় ইহুদী, খ্রিস্টান,মুসলমান শান্তিপূর্ণ সহাবস্হান এক দু’বছর নয় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সম্ভব। বোখারী শরীফের ২২২৭ নং হাদীসে রসূল (সঃ) বলেন, একজন মুক্ত মানুষকে যে বিক্রি করে দেয় তার বিরুদ্ধে আমি কিয়ামতে দাঁড়াব। আগে বেশ কিছু পন্হায় মানুষকে দাস বানানো হতো –

# ক: সবল দুর্বলকে জোর করে দাস বানাতো

# খ: অপহরণ করে অন্য জায়গায় বিক্রির মাধ্যমে

# গ:পাওনাদার দেনাদারকে দেনার বিনিময়ে

# ঘ: চুরি করে ধরা পড়লে শাস্তিস্বরূপ দাস বানানো হতো

# ঙ :  কেউ ইচ্ছে করে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিক্রি হয়ে যেত (এটি এখনও চলছে)

# চ: যুদ্ধবন্দীদের দাস বানানো হত।

ইসলামে প্রাথমিক যুগে দাস বানানো হলেও শুধু যুদ্ধবন্দীদের ক্রেত্রে প্রোযোজ্য ছিল। সেক্ষেত্রেও তাদের মুক্ত মানুষের মর্যাদা দেয়া হতো। তাদের হত্যার বদল হত্যার বিচার ছিল। যুদ্ধবন্দীদের ক্ষেত্রেও নির্দেশনা ছিল -দয়া বা মুক্তিপণ নিয়ে তাদের ছেড়ে দাও ওহী আসে – “অতঃপর হয় তাদের প্রতি অনুগ্রহ কর, না হয় তাদের নিকট হতে মুক্তিপণ নাও”। (৪৭:৪)

এরপর শুধু একটি যুদ্ধে দাস বানানোর ঘটনা ঘটেছিল। তাও রসূল (সঃ) সরদার কন্যাকে বিয়ে করেন এবং রসূলের (সঃ) সম্মানে সকল বন্দীকে মুক্তি দেয়া হয়। ১৮৩০ সালে আমেরিকায় দায় প্রথার পক্ষ -বিপক্ষ নিয়ে ভীষণ গোলমাল শুরু হয়। খ্রিস্টধর্মের দুইজন বড় সাধক সেন্ট একুইনাস ও সেন্ট অগাস্টিন দাস প্রথার পক্ষ অবলম্বন করেন। ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায় সেখানে। এই প্রথা ইউরোপ ও আফ্রিকার শান্তিও কেড়ে নিয়েছিল।

# তিন : ইসলামী অর্থনীতিতে উৎপাদনের প্রাথমিক ও সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হচ্ছে মানব সম্পদ। অথএব মানুষই উৎপাদনের মূল লক্ষ্য। এজন্যই এখানে শুধু শ্রমের নির্ধারিত বিনিময় নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। পুঁজির ক্ষেত্রে তা নয়। সেখানে লাভ -লোকসান থাকবে। নির্ধারিত বিনিময় পুঁজির ক্ষেত্রে হলে তা সুদ হবে। ইসলাম কর্মের নিরাপত্তার কথাও বলেছে, যাতে কেউ বেকার না থাকে । শ্রমের নির্ধারিত ও উপযুক্ত মূল্য পেলে দৈনন্দিন প্রয়োজনে ঘাটতি থাকার কথা নয়। এরপরও কারো অভাব বা প্রয়োজন দেখা দিলে প্রতিবেশী এবং আত্নীয় -স্বজনকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। দান -খয়রাতকে উৎসাহিত করা হয়েছে। তাতেও যদি ঘাটতি থাকে জাকাত ব্যবস্হা রয়েছে । অন্যদিকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে মানুষের অভাববোধ করার চাহিদাকে লাগাম টেনে ধরা হয়েছে। হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত রসূল (সঃ) বলেছেন, “তোমরা পার্থিব ধন -সম্পদে যারা তোমাদের চেয়ে নিচে তাদের প্রতি তাকাও। তাদের প্রতি তাকাবে না যারা তোমাদের উপরে। তাহলে তোমাদের অন্তরে আল্লাহর নেয়ামতের মহত্ত্ব ও গুরুত্ব হ্রাস পাবে না “।

অর্থাৎ উপরের দিকে তাকালে আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞ হবে। আর ব্যক্তিগত জীবন অশান্তির দাবানলে পুড়তে থাকবে। ইসলাম তার অনুসারীদের সব সময় অন্তর থেকে দুনিয়ার মহব্বত বের করে দিয়ে আল্লাহ ও তার রাসূলের (সাঃ) মহব্বত ঢুকানোর কথা বলেছে । হাদীসে কুদসীতে এসেছে , “যদি কোন বনি আদমকে সোনার একটি উপত্যকা দান করা হয়, তাহলে সে আশা করবে আরেকটি উপত্যকার। মাটি ছাড়া অন্য কিছু বনি আদমের পেট ভরাতে পারবে না “। সত্যিকার অর্থে অল্পে তুষ্ট জিন্দেগীই শান্তিপূর্ণ হয়। শেখ সাদী (রহঃ) গুলিস্তাতে একটি ঘটনা লেখেন,”একবার ভ্রমণে বের হলাম। এক ব্যবসায়ীর গৃহ রাত কাটাতে হলো। রাত ধরে ব্যবসায়ী তার বহু ব্যবসার বর্ণনা দিল। বহু দেশে তার দোকান আছে । এখন শুধু একটি শেষ সফরের ইচ্ছা। এই ইচ্ছাটি পূর্ণ হলে আর কিছু লাগবে না। দোয়া করেন যাতে আমার এই ইচ্ছাটি পূর্ণ হয়। জিজ্ঞেস করলাম, কী সেই ইচ্ছা? জবাবদিল ফরাসী গন্ধক নিয়ে চীন,চায়না সিরামিক নিয়ে ইতালি,ইতালির রেশমী নিয়ে ভারতে, ভারতের ইস্পাত সিরিয়ায়, সিরিয়ার সিসা ইয়েমেনে ,ইয়েমেনের চাদর পারস্যে বিক্রি করব ইত্যাদি”।  এই অদ্ভুত চাহিদা মানুষের জীবন থেকে শান্তি কেড়ে নিয়েছে।

# চার :  ইসলাম মানুষের নৈতিকতার উন্নয়ন ঘটিয়ে পরিশীলিত জীবনবোধ শিক্ষা দিয়েছে। সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর উপরস্হিতির বিষয়টি অনুভূতিতে এনে জবাব দিহিতা নিশ্চিত করার ব্যবস্তা করেছে। কাজের শুরু,যেকোনো কিছুর শুরু বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম দ্বারা। আল্লাহ সবই দেখেছেন । তিনি এত নিকটে, গর্দানের মূল ধমনীর চেয়েও নিকটে । এই অনুভূতি জাগ্রত থাকলে মানুষ কীভাবে চুরি -ডাকাতি  -রাহাজানি করে। দুর্নীতি ,ওজনে কম দেয়া,গীবত,চোগলখুরি করতে গিয়ে তার কলিজায় কাঁপন ধরার কথা।

“দূরে সাগরের তীরে একটি কুকুরও যদি অনাহারে মারা যায় তার জন্য আমাকে জবাবদিহি করতে হবে “। একজন শাসকের মুখ থেকে এমন বক্তব্য ইসলামই বের করেছে। national research liberal committee of germany এর library তে খলিফা উমরের উপর প্রায় সাত হাজার  বই ও থিসিস পেপার জমা হয়েছে । রিসার্স কমিটির প্রধান একজন মহিলা । তাঁর বক্তব্য আমার আইডল খলিফা উমর । ফ্রান্সের এক গবেষকের প্রশ্ন কেন ? মহিলা জবাব দেন, একটি বক্তব্যই যথেষ্ট।  যেটা নিয়ে আহমদ দিদাত ঘন্টার পর ঘন্টা লেকচার দিয়েছেন। আমর ইবনুল আস (রাঃ) (৫৮৫ -৬৬৪) তখন মিশরের গভর্নর (৬৪২ -৬৪৪ এবং ৬৫৭ –৬৬৪) । গভর্নরের ছেলে উবায়দুল্লাহ বিন আমর গ্রাম্য এক ছেলেকে মারধর করে। খলিফার কাছে নালিশ যায়। সাথে সাথে হযরত উমর আইন -শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধান মুহাম্মদ ইবনে মাসলামাকে নির্দেশ দিলেন গভর্নর ও তার ছেলেলেকে আমার দরবারে হাজির কর। হজের মওসুম ছিল । তাদেরকে মক্কায় আনা হলো।

নির্যাতিত ছেলেটিকে খলিফা নির্দেশ দিলেন তোমাকে যে ক’টি মেরেছে গুনে গুনে ছেলেটিকে ঠিক ততটি মারো। আর একটি মারো তার বাবাকে। ভিকটিম ছেলে বলে গভর্নর তো আমাকে মারেনি,তিনি উপস্তিতও ছিলেন না। খলিফা বললেন, না থাকুক,তুমি তার শাসনাধীন ছিলে । আর নিজের ছেলেকে আগলে রাখতে পারেন নি কেন ? এরপর খলিফা উমর আমর ইবনুল আস (রাঃ) কে বললেন, ইয়া আমর, মাতা তা আব্বাদুতুমুন নাস ওয়াক্বাদ ওয়ালাদাতাহুম উম্মাহাতুহুম আহরারান। হে আমর, মানুষগুলোকে তুমি কবে থেকে গোলাম বানিয়ে রাখতে শুরু করেছ অথচ তাদের মা তাদেরকে মুক্ত মানুষ হিসেবে জন্ম দিয়েছিল। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ )কে খায়বার পাঠানো হয়েছিল ইহুদীদের উৎপাদিত ফসলের বিলিবন্টন এবং সরকারের ভাগ বুঝে নেয়ার জন্য। ইহুদীগণ গয়নাপাত্রের একটি স্তূপ পেশ তরল তার সামনে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন,এসব কী ? তারা বলল,এসব আপনার জন্য। বিনিময়ে আমাদের ভাগ ঠকমত দেবেন । জবাবে তিনি বললেন,এসব নিয়ে যাও। গোটা দুনিয়ার সম্পদও যদি আমাকে দিয়ে দাও তবুও বলছি। সরকারি পাওনা এক বান্দু কম নেবো না আর তোমাদের যা প্রাপ্য এক রশি এদিক ওদিক হবে না। ইহুদীরা বলে ওঠে,লাইসা হাজিহী কামাতিস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ। এ ধরনের সুবিচারপূর্ণ ব্যবস্তার উপরই আসমান ও জমিন দাঁড়িয়ে আছে।

# পাঁচ :  জাতি,ধর্ম,বর্ণ নির্বিশেষে ইসলাম নারীকে মর্যাদা ও সম্মান দিয়েছে। কুরআনের ঘোষণা – “আর ঈমানদার -পুরুষ ও নারী একে অপরের সহায়ক “(৯:৭১ )

“যে লোক পুরুষ হোক কিংবা নারী,কোনো সৎকর্ম করে এবং বিশ্বাসী হয়,তবে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রাপ্য তিল পরিমানও নষ্ট হবে না “।(৪:১২৪)  সেই আইয়্যামে জাহেলিয়াতের যুগে যখন নারীদের জন্মকে স্বীকার করা হতো না।

ইসলাম মা -বোনের সম্মান ও অধিকার দিয়েছে ।মানুষ হিসেবে, নাগরীক হিসেবে এমনকি যুদ্ধ ক্ষেত্রেও অংশ নেয়ার মর্যাদা দিয়েছে। অথচ তার হাজার বছর পরেও অন্যান্য জাকি,রাষ্ট্র নারীদের অধিকার দিতে গড়িমসি করছে । নিউজিল্যান্ড (বৃটিশ কলোনি) নারীদের নাগরীক অধিকার স্বীকার করে ১৪৯৩ সালে,অস্ট্রেলীয়া ১১৮৯৫ সালে,ফেডারেল অস্ট্রেলিয়া ১৯০২ সালে,নরওয়ে ১৯১৩ সালে,আমেরিকা ১৯২০ সালেসালে নারীদের ভোটাধিকার স্বীকার করে । সুইডেন ১৯২১ সালে,স্পেন ১৯২৪ সালে,যুক্তরাজ্য সার্বিকভাবে ১৯২৮ সালে , নেদারল্যান্ড ১৯৩৭সালে, ফ্রান্স ১৯৪৪সালে (অথচ ফরাসী বিপ্লব হয় ১৭৮৯, ইটালি ১৯৪৬সালে, গ্রীস ১৯৫২ সালে,সুইজারল্যান্ড ১৯৭১সালে নারীদের ভোট দেয়ার অধিকার প্রদান করে। যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক অধিকার স্বীকার করা হয়। ১৯৫২ সালে ।

# ছয়: ইসলাম মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতা ও বিশ্বাসের স্বাধীনতা কে সম্মান দেখিয়েছে। ৭১ সালের দিকে রোমানরা ইহুদীদের পরাজিত করে জেরুজালেম দখল করে। তবে জেরুজালেম ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকা এক সময় পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। রোমান সম্রাট কন্সটানটাইনের সময় জেরুজালেম খ্রিস্টানদের নিকট গুরুত্বপূর্ন হয়ে উঠে। সেখানে তারা গীর্জা তৈরী করে। ৬৩৭ সালে ফিলিস্তিনে মোড় ঘুরানো ইতিহাস সংগঠিত হয়। মুসলমানরা ফিলিস্তিন বিজয় করে ইহুদীদের জেরুজালেমে বসবাসের আমন্ত্রণ জানায় যা তাদের বহিস্কারের ৫০০ বছর পর। খ্রিস্টানদেরও থাকতে দেয়া হয়। এর আগে বছরের পর বছর যুদ্ধ,সংঘাত আর অশান্তি লেগেই ছিল।  ইসলাম আসার পরই প্রথম সব ধর্মের মানুষ শান্তির সন্ধান পেল। ইহুদী,খ্রিস্টান ও মুসলমানদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্হান পৃথিবীবাসী প্রত্যক্ষ করল । পরবর্তীতে ইউরোপের খ্রিস্টানগণ পোপ আর্বান -২ এর ডাকে ১০৯৫ সালের ২৫ নভেম্বর ক্রুসেডের সিদ্ধান্ত নিয়ে এক লক্ষের অধিক লোক জড়ো হয়। পবিত্র ভূমি মুসলমানদের হাত থেকে উদ্ধার করার জ্য রওয়ানা দেয়। লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে ও পথে পথে মুসলিম হত্যার মধ্য দিয়ে তারা ১০৯৯ সালে জেরুজালেম পৌঁছে। বেশ কয়েক সপ্তাহ অবরোধ করার পর শহরের পতন ঘটে ও ক্রুসেডারগণ শহরে প্রবেশ করে । শহরের সকল মুসমান ও ইহুদী ক্রুসেডারদের তলোয়ারের তলায় পড়ে । তারা নারী -পুরুষ নির্বিশেষে সকল আরব ও তুর্কীকে হত্যা করে।  দু’দিনে ক্রুসেডারগণ কম করে হলেও চল্লিশ হাজার মুসলমানকে হত্যা করে বর্বরতম উপায়ে । raymond of aguiles নামে এক ক্রুসেডার দম্ভভরে বলে -মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখার মতোই আমাদের কিছু লোক শত্রুদের মাথা কাটছে।  অন্যরা তীর নিক্ষেপ করছে যাতে শত্রুরা টাওয়ার হতে নিচে পতিত হয় । অন্যরা তাদের লম্বা সময় টর্চার করছে অগ্নিশিখায় ঝঝলসানোর মাধ্যমে। মাথা,হাত এবং পা শহরের রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। মানুষ ও ঘোড়ার লাশ সরিয়ে চলাচলের রাস্তা করার প্রয়োজন হলো । কিন্তু সোলাইমানের সমাধির ঘটনা আরও ব্যতিক্রম। সেখানে রাস্তায় মানুষ দৌড়াচ্ছিল তাদের হাঁটু অবধি রক্তের মধ্যে। ক্রুসেডারগণ জেরুজালেমকে তাদের রাজধানী ঘোষণা করে। হাট্রিনের যুদ্ধে ১১৮৭ সালের ২ অক্টোবর গাজী সালাহ উদ্দিন আইউবীর নেতৃত্বে মুসলমানগণ ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করে জেরুজালেম মৃক্ত করেন। যুদ্ধেশেষে ক্রুসেডার বাহিনীর দুই নেতা রেনল্ড চাটিলন এবং রাজা গাইকে সালাহ উদ্দিন আইউবী সামনে হাজির করা হয় ।আইউবী চাটিলনকে হাজার হাজার হাজার মানুষ হত্যার দায়ে মৃত্যুদন্ড দেন। রাজা গাইয়ের অপরাধ ঐ পর্যায়ে  না থাকায় তাকে মুক্তি দেন। আইউবী একজন খ্রিস্টানের গায়েও হাত দেননি । বরং ক্যাথলিক ক্রুসেডারদের তিনি জেরুজালেম ত্যাগ করতে বলেন । অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের থাকতে বলেন এবং ইচ্ছামতো ধর্মকর্ম করতে দেন। মুসলমানরা যখন স্পেন শাসন করে তখন তা ইউরোপের বুদ্ধিবৃত্তি কেন্দ্র ছিল। দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা পড়তে আসত।  দর্শন, বিজ্ঞান, মেডিকেল সাইন্স সবকিছুর শ্রেষ্ঠ জায়গা ছিল গ্রানডা,কর্ডোভা। মুসলিম ছাড়াও খ্রিস্টান ও ইহুদী পন্ডিতদের সেখানে জায়গা দেয়া হয় । অথচ ইউরোপের অমুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে এধরনের সহাবস্হান লক্ষ্য করা যেত না।

# সাত :  অধিকার  (হুক্কুক) ও পারস্পরিক দায়বোধের (ওয়াজিবাত) কথা বলেছে ইসলাম যা ন্যায়বিচারের পূর্বশর্ত। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ন্যায়ভিত্তক শাসন ও বিচার ব্যবস্তা জরুরি। একজনের অধিকার অন্যজনের দায়িত্ব । মাতা -পিতা, স্বামী -স্ত্রী,সন্তান -সন্ততি সর্বক্ষেত্রেই অধিকার ও দায়িত্বের সমন্বয় জড়িত। এমন ন্যায় ভিত্তিক রাষ্ট্র ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছে। অর্ধ -দুনিয়ায় যার ফলে তাৎপর্যপূর্ণ কোনো অপরাধ সংঘটিত হতে দেখা যায় নি। মানুষের জীবন ও ইজ্জত যে নিরাপত্তা পেয়েছিল তার প্রভাব জঙ্গলের পশুর মধ্যেও পড়েছে। সাধারণ মানুষ খলিফার বিরুদ্ধে, গভর্নরের বিরুদ্ধে , শাসকের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ করতে পারতো নির্ভয়ে । রাষ্ট্রপ্রধানের বক্তব্য থামিয়ে দিয়ে প্রশ্নের উত্তর তলব করার মতো ঘটনার উদাহরন আর কোথাও দেখা যায়নি। মুলত শান্তি,নিরাপত্তা আর স্হিতিশীলতা একমাত্র ইসলামই আনতে পারে। মানুষের ইহকালীন যাবতীয় কল্যাণ নিশ্চিত করতে হলে এবং পরকালীন চিরস্হায়ী জীবনের মুক্তি অর্জন করতে চাইলে ইসলামকেই অনুসরণ করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*